টমেটোর রোগ প্রতিরোধী গুনাগুণ

টমেটো, ফল নাকি সবজি? আসলে টমেটো একটি ফল যা সবজি হিসেবে ব্যাবহৃত হয়। সালাদ, সস, স্যুপ, জুস ইত্যাদি নানা খাবারে আমরা টমেটো ব্যবহার করে থাকি। এই যে আমরা এতগুলো খাবারে টমেটো ব্যবহার করি, আমরা কি জানি টমেটো আমাদের ঠিক কতটা উপকারে আসে? টমেটো তে আছে প্রায় ৯৫% পানি, ৪% শর্করা এবং ১% এর ও কম পরিমানে চর্বি ও আমিষ।

টমেটোতে আরও আছে খাদ্যআঁশ, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ভিটামিন ই, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, কপার, মলিবডেনাম, ফোলেট, বায়োটিন, নায়াসিন, ভিটামিন বি৬ ইত্যাদি ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। এছাড়াও রয়েছে চারটি প্রধান ক্যারোটিনয়েডস্ : আলফা-ক্যারোটিন, বিটা-ক্যারোটিন, ল্যুটেইন ও লাইকোপেন। ১০০ গ্রাম টমেটো প্রায় ১৮ ক্যালরি শক্তি যোগান দেয় এবং ভিটামিন সি এর দৈনিক চাহিদার প্রায় ১৭% পূরন করে।

টমেটোর এ উপাদানগুলো আমাদের সুস্থতা রক্ষায় কিভাবে কাজ করে চলুন জেনে নেইঃ

১. ক্যান্সার প্রতিরোধক : টমেটোতে রয়েছে ভিটামিন সি এবং আরও কিছু অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা ক্ষতিকর মুক্ত মূলক এর বিরূদ্ধে যুদ্ধ করে। এ মুক্ত মূলকগুলো ক্যান্সার এর জন্য দায়ী।

Journal of the National Cancer Institute সাময়িকী তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায় যে যাদের খাদ্যে লাইকোপেন নামক উপাদান থাকে তাদের প্রোস্টেট ক্যান্সার এ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২১% পর্যন্ত কম।এছাড়া খাদ্যে বিটা-ক্যারোটিন এর উপস্থিতি ও প্রোস্টেট ক্যান্সার এর বিরূদ্ধে ভূমিকা রাখে।

Journal of Cancer Prevention সাময়িকী এর একটি গবেষণাপত্রে দেখা যায় টমেটোর উপাদান লাইকোপেন পাকস্থলির ক্যান্সার এর ঝুঁকি কমায়।আরেকটি গবেষণায় দেখা যায় যে, বিটা-ক্যারোটিন কোলন ক্যান্সার এর ঝুঁকি কমায়। খাদ্যআঁশ কোলোরেক্টাল ক্যান্সার এর ঝুঁকি কমায়। আর টমেটোতে লাইকোপেন, বিটা-ক্যারোটিন ও খাদ্যআঁশ বিদ্যমান।

২. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে : খাদ্যে সোডিয়াম এর মাত্রা কমিয়ে পটাসিয়াম এর মাত্রা বাড়ানো হলে তা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রন করে। আর একটি মাঝারি আকৃতির টমেটোতে রয়েছে প্রায় ৩০০ মি.গ্রা পটাসিয়াম। পটাসিয়াম রক্তবাহিকা সমূহকে প্রসারিত রাখে। ফলে রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে।

৩. হৃদপিন্ডের সুস্থতায় : টমেটোতে বিদ্যমান খাদ্যআঁশ, পটাসিয়াম, ভিটামিন সি, কোলাইন হৃদপিন্ডের সুস্থতায় সহায়ক ভূমিকা রাখে।
টমেটোতে আরও আছে ফোলেট। ফোলেট হিমোসিস্টিন নামক একটি অ্যামিনো এসিড এর ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে যা প্রোটিনের ভাঙ্গনের ফলে তৈরি হয়। এটা হার্ট অ্যাটাক্ ও স্ট্রোক এর সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। ফোলেট এই হিমোসিস্টিন এর মাত্রা নিয়ন্ত্রন করে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস করে।

Current Medical Chemistry এর ২০১১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, খাদ্যে লাইকোপেন এর উপস্থিতি হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।
Archives of International Medicine এ প্রকাশিত ১২,০০০ ব্যক্তির উপর করা একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, যারা দৈনিক ৪০৬৯ মি.গ্রা পটাসিয়াম গ্রহন করে তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি ৩৭% পর্যন্ত হ্রাস পায়।

৪. কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে : উচ্চ খাদ্যআঁশ এবং পানি যুক্ত খাদ্য যেমন টমেটো, দেহের পানি শূন্যতা দূর করতে এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক ক্রিয়া বজায় রাখতে সহায়তা করে।খাদ্যআঁশ মল নরম করে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। আর টমেটো দৈনিক খাদ্যআঁশ এর চাহিদার প্রায় ৯% পূরন করে।

৫. চোখের সুস্থতায় : লাইকোপেন, ল্যুটেইন, বিটা-ক্যারোটিনএর মত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এর উৎকৃষ্ট উৎস হলো টমেটো। এই শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্টগুলো চোখের ছানি পড়তে বাঁধা দেয়, বয়স বৃদ্ধিজনিত চোখের রোগ এর বিরূদ্ধে কাজ করে।
বয়স বৃদ্ধিজনিত চোখের সমস্যার উপর করা একটি গবেষণায় দেখা গিয়ছে যে খাদ্যে পর্যাপ্ত পরিমান ক্যারোটিনয়েডস্, ল্যুটেইন এবং জিয়ায্যানথিন গ্রহন বয়স বৃদ্ধিজনিত স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি ৩৫% হ্রাস করে। আর উক্ত ৩ টি উপাদানই টমেটোতে বিদ্যমান।

৬. ত্বকের সুস্থতায় : ত্বক, চুল, নখ ও সংযোজক কলার সুস্থতার জন্য কোলাজেন একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।কোলাজেন ত্বককে প্রাণবন্ত ও সতেজ করে তোলে। দেহে কোলাজেন তৈরির প্রক্রিয়া নির্ভর করে ভিটামিন সি এর উপর। টমেটোতে ভিটামিন সি বিদ্যমান।লাইকোপেন ও বিটা-ক্যারোটিন ত্বককে রোদে পোড়ার হাত থেকে রক্ষা করতে কার্যকর। যা Photochemistry and Photobiology নামক সাময়িকী প্রকাশিত হয়েছে। এ গবেষণায় দেখা গিয়েছে যারা ১০ সপ্তাহ ধরে বিটা-ক্যারোটিনযুক্ত খাদ্য গ্রহন করেছে তাদের ত্বকে অন্যদের তুলনায় রোদে পোড়া ভাবটা কম। এ উপাদানটি টমেটোতে পাওয়া যায়।

বিটা-ক্যারোটিন দেহের অভ্যন্তরে ভিটামিন এ তে রূপান্তরিত হয়। আর ভিটামিন এ এর একটি যৌগ- রেটিনয়েডস্ বলিরেখার বিরূদ্ধে যুদ্ধ করে। 

৭. গর্ভাবস্থায় : নবজাতকের নাভিরজ্জুর সুরক্ষার জন্য গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত পরিমানে ফোলেট গ্রহন করা দরকার। এজন্য গর্ভবতী মহিলাদের ফলিক এসিড সম্পূরক গ্রহন করতে বলা হয়। ফলিক এসিড ফোলেট এর কৃত্রিম রূপ। টমেটোতে প্রাকৃতিকভাবে ফোলেট পাওয়া যায় যা গ্রহন করা উত্তম।

৮. রক্তবাহিকার সুস্থতায় : Blood Coagulation Fibrinolysis সাময়িকী হতে দেখা যায় টমেটোর ফাইটোনিউট্রিয়েন্টগুলো অনুচক্রিকার অতিরিক্ত জমাটকরন রোধ করে। এর ফলে রক্তবাহিকায় বাঁধা সৃষ্টি হতে পারতো।
University of Maryland Medical Centre নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জানা যায় যে ভিটামিন সি এবং লাইকোপেন খারাপ কোলেস্টেরল এল.ডি.এল কমায় এবং রক্তবাহিকাগুলোকে সাবলীল রাখে।

৯. বিপাকীয় কর্যক্রম : Journal of Nutrition সাময়িকী অনুযায়ী, টমেটোতে উপস্থিত বিটা-ক্যারোটিন মধ্য বয়স এবং বৃদ্ধ বয়সের বিপাকীয় সমস্যা কমায়। উল্লেখযোগ্য বিপাকীয় সমস্যাগুলো হলো – উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি, রক্তের কোলেস্টেরল এর মাত্রার অস্বাভাবিকতা, কোমরে অতিরিক্ত মেদ জমা, ইত্যাদি।

১০. অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ক্ষমতা : প্রবলভাবে কার্যকর বেশ কিছু ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট এবং ভিটামিন টমেটোতে উপস্থিত যেগুলোর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ক্ষমতা বিদ্যমান, এদের মধ্যে লাইকোপেন উল্লেখযোগ্য। Archives of Biochemistry and Biophysics সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় পাওয়া যায় যে, লাইকোপেন ক্ষতিকর মুক্ত মূলকসমূহকে ধ্বংস করতে অত্যাধিক কার্যকর একটি ক্যারোটিনয়েড।
Pharmacognosy Review সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায় টমেটোতে বিদ্যমান ভিটামিনগুলো অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রূপে কাজ করে যা মুক্ত মূলকগুলোকে জারিত হওয়া থেকে প্রতিরোধ করে।

১১. হাড় মজবুত করে : টমেটোতে বিদ্যমান লাইকোপেন হাড়ের সুরক্ষায় এবং অস্টিওপোরোসিস এর বিরূদ্ধে কাজ করে। Journal of Bone and Mineral Research এর একটি গবেষণা অনুযায়ী, যাদের রক্তে উচ্চ মাত্রায় লাইকোপেন উপস্থিত তাদের কোমরের বা মেরুদন্ডের হাড়জনিত সমস্যা অন্যদের তুলনায় কম।

Osteoporosis International সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায়, যেসব নারীদের মেনোপজ হয়ে গেছে তাদের চার মাসের খাদ্যতালিকায় লাইকোপেন যুক্ত করার ফলে দেখা যায় তাদের হাড় ক্ষয়ের মাত্রা অন্যদের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।

১২. স্ট্রোক এর ঝুঁকি কমায় : টমেটোতে বিদ্যমান লাইকোপেন স্ট্রোক এর ঝুঁকি হ্রাস করে; বিশেষ করে পুরুষের ক্ষেত্রে। Neurology সাময়িকীতে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় যেখানে দেখা যায়, যেসব মধ্য বয়স্ক পুরুষদের খাদ্যতালিকায় উচ্চ মাত্রায় লাইকোপেন দেয়া হয়েছে তাদের সব ধরনের স্ট্রোকের ঝুঁকি ৫৫% পর্যন্ত হ্রাস পায়। আর রক্ত জমাট বাঁধা জনিত স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে ৫৯% পর্যন্ত।

১৩. অ্যাজমার বিরূদ্ধে :
অ্যাজমার সমস্যা কমাতে টমেটোতে উপস্থিত লাইকোপেন সাহায্য করে Allergy সাময়িকী একটি গবেষণাপত্র প্রকাল করে যেখানে উল্লেখ করা হয়ছে যে যাদের খাদ্যে লাইকোপেন বিদ্যমান তাদের ব্যায়াম জনিত শ্বাসকষ্ট হ্রাস পায়।

১৪. পেশী, স্নায়ু ও কোষকলার সুরক্ষায় : Heather Magieri – একজন পুষ্টিবিদ এবং Academy of Nutrition and Dietetics এর একজন সদস্য উল্লেখ করেন, “টমেটোতে রয়েছে প্রচুর পরিমানে পটাসিয়াম যা স্নায়ু এবং পেশীর কার্যাবলি নিয়ন্ত্রনে ভূমিকা রাখে।” তিনি আরও বলেন, “পটাসিয়াম হৃদস্পন্দন ঠিক রাখে। এছাড়াও কোষের ভিতর পুষ্টি উপাদানসমূহ পৌছিয়ে দিতে এবং কোষ থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করতে সহায়তা করে।”

টমেটোকে একটি পুষ্টিমন্ডিত সুপার-ফুড বলে উল্লেখ করা হয়েছে এর অসংখ্য পুষ্টি গুনাবলির জন্য। একটি মাঝারি আকৃতির টমেটো থেকে আপনি পাচ্ছেন যৎসামান্য ক্যালরি অথচ অনেক পুষ্টি উপাদান যা আপনাকে রাখবে সুস্থ, সতেজ ও প্রাণবন্ত। তাই আপনার দৈনিক খাদ্যতালিকায় রাখুন টমেটোর তৈরি যেকোন খাবার।

লেখক-
জিনাতুল-জাহরা-ঐশী
খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান।

Please follow and like us:
20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *