খাদ্য পুষ্টি ১২টি অনন্য গুণে ভরা কালিজিরার ব্যবহার, খাওয়ার নিয়ম এবং সতর্কতা

কালিজিরা পেটের জন্য ভালো। আছে আরও নানা গুণ। মসলা বা উপকারী ঔষধির কথা উঠলেই কালো কালো এই মিহি দানার নামটা আসে। কালিজিরা সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে ওজন কমাতে। যাঁরা সঠিক নিয়মে নিয়মিত কালিজিরা খান, তাঁরা দ্রুত ওজন কমিয়ে ফেলতে পারেন বলেই জানানো হয়েছে এনডিটিভি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে।

জেনে নিন কালিজিরার ১২ গুণের কথা:

১. নিয়মিত কালোজিরা খেলে দেহে রক্ত সঞ্চালন ঠিকমতো হয়। এতে করে মস্তিস্কে রক্ত সঞ্চালনের বৃদ্ধি ঘটে; যা আমাদের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। যাঁরা অস্থিরতায় ভোগেন, তাঁদের জন্য কালিজিরা দারুণ উপকারী।
২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। নিয়মিত কালোজিরা খেলে শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সতেজ থাকে। এটি যেকোনো জীবানুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেহকে প্রস্তুত করে তোলে এবং সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যের উন্নতি করে।
৩. রক্তে চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। যাঁরা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, তাঁদের জন্য কালিজিরা খুব কার্যকর। কালোজিরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের রক্তের গ্লুকোজ কমিয়ে দেয়। ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।
৪. কালোজিরা উচ্চ রক্তচাপ স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি রক্তে বাজে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমায় এবং উচ্চ রক্তচাপ হ্রাস করে শরীরে রক্তচাপের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখে।
৫. কালোজিরা নারী-পুরুষ উভয়ের যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি করে। প্রতিদিন খাবারের সঙ্গে কালোজিরা খেলে পুরুষের স্পার্ম সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এটি পুরুষত্বহীনতা থেকে মুক্তির সম্ভাবনাও তৈরি করে।
৬. নিয়মিত কালোজিরা খেলে রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেলের পরিমাণ হ্রাস হতে থাকে। ফলে রক্তসঞ্চালন প্রক্রিয়া সঠিক ভাবে পরিচালনা করতে হৃৎপিন্ডের কোনো বাধার মুখে পড়তে হয় না। তাই হৃদযন্ত্র থাকে সুস্থ এবং কর্মক্ষম।
৭. গেঁটে বাত বা অস্থিসন্ধির ব্যথা দূর করতে কার্যকর কালিজিরা। কালোজিরার থেকে তৈরি তেল আমাদের দেহে বাসা বাঁধা দীর্ঘমেয়াদী রিউমেটিক এবং পিঠে ব্যথা দূর করতেও সাহায্য করে। এছাড়া সাধারণভাবে কালোজিরা খেলেও অনেক উপকার পাওয়া যায়।
৮. যাঁরা মাথাব্যথায় ভোগেন, তাঁদের জন্য কালিজিরা উপকারী।
৯. কালোজিরার অন্যতম প্রধান গুণ হলো এটি ত্বকের কোমলতা ও লাবন্য বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি ত্বকের বিভিন্ন রোগ যেমন ব্রণ দূর করে।
১০. কালোজিরা মাথার ত্বকে অতিসূক্ষ রক্তনালীগুলোতেও রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। ফলে চুল তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে শুরু করে। তাই চুল পড়া রোধে দারুণ কার্যকর।
১১. যাঁরা অ্যাজমা বা হাঁপানির সমস্যায় ভোগেন, তাঁদের জন্যও উপকারী। প্রতিদিন কালোজিরার ভর্তা খেলে হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা উপশম হয়।
১২. পাইলস, কোষ্ঠকাঠিন্য, যকৃতের সমস্যায় বা জন্ডিস থেকে দ্রুত সেরে উঠতে কালিজিরা বেশ দ্রুত কাজে লাগে।

খাবেন কীভাবেঃ

ওজন কমাতে কীভাবে খাবেন, জেনে নিন। কয়েকটি কালিজিরার দানা নিয়মিত খেলে মেদ ঝরতে শুরু করবে। কালিজিরায় আছে বিশেষ ধরনের ফাইবার বা আঁশ, যা অতিরিক্ত খাওয়া নিয়ন্ত্রণে রাখে। খাবারের মধ্যে একটু কালিজিরা মিশিয়ে নিলে স্বাদ যেমন বাড়ে, তেমনি পুষ্টিগুণও বেড়ে যায়।

১. পানি, লেবু ও মধুর সঙ্গে: হালকা গরম পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে তা আগে খেয়ে ফেলুন। এবার হালকা গরম পানির সঙ্গে কয়েকটি কালিজিরার বীজ খেয়ে ফেলুন। শেষে এক চামচ মধু খান। কালিজিরা খাওয়ার আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে হালকা গরম পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে তাতে কালিজিরার গুঁড়া যোগ করা। তিন-চারটি দানা গুঁড়ো করে লেবু-পানিতে যুক্ত করতে হবে। কারণ, বেশি কালিজিরা যুক্ত করলে হজমে গোলমাল হতে পারে। এরপর ওই পানির মধ্যে এক চামচ মধু মিশিয়ে খেতে পারেন। এতে মেদ কমবে পেশি সুগঠিত হবে।

২. লেবু ও কালিজিরা: কিছু কালিজিরা একটি বাটিতে রেখে তার ওপর লেবুর রস চিপে দিন। কালিজিরা ভিজে গেলে তা রোদে শুকিয়ে নিন আবার। দিনে দুবার ৮-১০টি করে কালিজিরার দানা খান। পেটের চর্বি কমতে শুরু করবে।

৩. সবজিতে: যখনই কোনো সবজি গ্রিল করবেন, চাটনি বা সালাদ বানাবেন, তখন পুষ্টিগুণের কথা মাথায় রেখে কয়েক দানা কালিজিরা যুক্ত করুন। প্রাকৃতিক উপায়ে ওজন কমানোর নিরাপদ পদ্ধতি এটি।

কালোজিরার ব্যবহারঃ

১. তিলের তেলের সাথে কালিজিরা বাঁটা বা কালিজিরার তেল মিশিয়ে ফোড়াতে লাগালে ফোড়ার উপশম হয়। রুচি, উদরাময়, শরীর ব্যথা, গলা ও দাঁতের ব্যথা, মাইগ্রেন, চুলপড়া, সর্দি, কাশি, হাঁপানি নিরাময়ে কালিজিরা সহায়তা করে। ক্যান্সার প্রতিরোধক হিসাবে কালিজিরা সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
২. চুলপড়া, মাথাব্যথা, অনিদ্রা, মাথা ঝিমঝিম করা, মুখশ্রী ও সৌন্দর্য রক্ষা, অবসন্নতা-দুর্বলতা, নিষ্কিয়তা ও অলসতা, আহারে অরুচি, মস্তিষ্কশক্তি তথা স্মরণশক্তি বাড়াতেও কালোজিরা উপযোগী।
৩. কালোজিরা চূর্ণ ও ডালিমের খোসাচূর্ণ মিশ্রন, কালোজিরা তেল ডায়াবেটিসে উপকারী।
৪. চায়ের সাথে নিয়মিত কালোজিরা মিশিয়ে অথবা এর তেল বা আরক মিশিয়ে পান করলে হৃদরোগে যেমন উপকার হয়, তেমনি মেদ ও বিগলিত হয়।
৫. মাথা ব্যথায় কপালে উভয় চিবুকে ও কানের পার্শ্ববর্তি স্থানে দৈনিক ৩/৪ বার কালোজিরা তেল মালিশ করলে উপকার পাওয়া যায়।
৬. কফির সাথে কালোজিরা সেবনে স্নায়ুবিক উত্তেজনা দুরীভুত হয়।
৭. জ্বর, কফ, গায়ের ব্যথা দূর করার জন্য কালিজিরা যথেষ্ট উপকারী বন্ধু। এতে রয়েছে ক্ষুধা বাড়ানোর উপাদান। পেটের যাবতীয় রোগ-জীবাণু ও গ্যাস দূর করে ক্ষুধা বাড়ায়।
৮. কালিজিরায় রয়েছে অ্যান্টিমাইক্রোরিয়াল এজেন্ট, অর্থাৎ শরীরের রোগ-জীবাণু ধ্বংসকারী উপাদান। এই উপাদানের জন্য -শরীরে সহজে ঘা, ফোড়া, সংক্রামক রোগ (ছোঁয়াচে রোগ) হয় না।
৯. সন্তান প্রসবের পর কাঁচা কালিজিরা পিষে খেলে শিশু দুধ খেতে পাবে বেশি পরিমাণে।
১০. মধুসহ প্রতিদিন সকালে কালোজিরা সেবনে স্বাস্থ্য ভালো থাকে ও সকল রোগ মহামারী হতে রক্ষা পাওয়া যায়।
১১. দাঁতে ব্যথা হলে কুসুম গরম পানিতে কালিজিরা দিয়ে কুলি করলে ব্যথা কমে; জিহ্বা, তালু, দাঁতের মাড়ির জীবাণু মরে।
১২. কালিজিরা কৃমি দূর করার জন্য কাজ করে।
১৩. কালিজিরা মেধার বিকাশের জন্য কাজ করে দ্বিগুণ হারে। কালিজিরা নিজেই একটি অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিসেপটিক।
১৪. দেহের কাটা-ছেঁড়া শুকানোর জন্য কাজ করে।
১৫. নারীর ঋতুস্রাবজনীত সমস্যায় কালিজিরা বাটা খেলে উপকার পাওয়া যায়।
১৬. কালোজিরার যথাযথ ব্যবহারে দৈনন্দিন জীবনে বাড়তি শক্তি অজির্ত হয়। এর তেল ব্যবহারে রাতভর প্রশান্তিপর্ন নিদ্রা হয়।
১৭. প্রসূতির স্তনে দুগ্ধ বৃদ্ধির জন্য, প্রসবোত্তর কালে কালিজিরা বাটা খেলে উপকার পাওয়া যায়। তবে গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত কালিজিরা খেলে গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে।
১৮. প্রস্রাব বৃদ্ধির জন্য কালিজিরা খাওয়া হয়।
১৯. কালোজিরা যৌন ব্যাধি ও স্নায়ুবিক দুর্বলতায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য অতি উতকৃষ্ট ঔষধ।

সতর্কতাঃ
কখনোই বেশি পরিমাণ কালিজিরা একবারে খাবেন না। এতে পিত্ত সমস্যা হতে পারে। সন্তানসম্ভবা নারীদের ক্ষেত্রেও কালিজিরা খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, কালিজিরা শরীর অতিরিক্ত গরম করে।

Please follow and like us:
20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *