শতকোটি টাকার মালিক সেই হিসাবরক্ষকের ভাইও কোটিপতি

ঢাকার মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতালের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী (হিসাব রক্ষক) লিয়াকত হোসেন জুয়েল ও তার স্ত্রী লাকি আক্তার চৌধুরীর নামে ফরিদপুরে রয়েছে শত কোটি টাকার সম্পদ। বড় ভাইয়ের মতো তিনিও সরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষক হিসেবে চাকরি করেন।

লিয়াকত সম্পত্তি গড়েছেন নিজ জেলা ফরিদপুরে। নিজের নামের পাশাপাশি স্ত্রী লাকি আক্তার চৌধুরী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকদের নামেও করা হয়েছে সম্পদের পাহাড়।

এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে দুটি ইটভাটা, দুটি বহুতল ভবন, বিপুল পরিমাণ জমি, আটটি জাহাজ। স্থানীয় বাজারে এসব সম্পদের মূল্য ৩০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

গোয়েন্দা সূত্রে তথ্য পেয়ে লিয়াকত ও তার আরেক ভাই এবং আবজালের তিন শ্যালককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। তবে লিয়াকত তার সম্পদের কথা বেমালুম অস্বীকার করেছেন। আর দুদকও সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়ায় এখন পর্যন্ত তদন্ত তেমন আগাতে পারেনি।

যেসব সম্পদের খোঁজ মিলল

ফরিদপুর শহরের টেপাখোলায় লক্ষ্মীপুর এলাকায় স্ত্রীর নামে বাড়ি করেছেন লিয়াকত হোসেন। ফরিদাবাদেও ‘মাহি মাহাদ ভিলা’ নামে আরেকটি বাড়ি আছে যেখানে বসবাস করেন তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন। দুটি বাড়িরই জমি কেনা ও নির্মাণবাবদ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে।

সিঅ্যান্ডবি ঘাটের বাজারে ১৭ শতাংশ জমিতে রয়েছে আরেকটি দোতলা ভবন। এই এলাকায় প্রতি শতাংশ জমির দাম শতাংশে পাঁচ লাখ টাকার বেশি।
শহরতলীর বায়তুল আমান এলাকায় স্ত্রীর নামে পাঁচ কাঠার আবাসিক প্লট। ফরিদপুরে আড়াই শতকে এক কাঠা ধরা হয় এবং এই এলাকায় জমির দাম শতাংশে দুই লাখ টাকার বেশি। এই হিসাবে পাঁচ কাঠার প্লটের দাম নিদেনপক্ষে ২৫ লাখ টাকা।

নর্থ-চ্যানেল গোলডাঙ্গী চরে এলঅ্যান্ডএমএম নামে ইট-ভাটাও রয়েছে লিয়াকতের। সিঅ্যান্ডবি ঘাটের ওপারে নাজিরপুরে এঅ্যান্ডআর ব্রিকস করা হয়েছে বড় বোন নাসরিন আক্তারের নামে।

একেকটি ইটভাড়ায় কমপক্ষে পাঁচ একর জমি আছে। এই এলাকায় শতাংশে এক লাখ টাকার কমে জমি পাওয়া যায় না। ফলে একেকটি ইটভাটাতেই অন্তত পাঁচ কোটি টাকার কেবল জমি আছে।

শহরের ভাটি লক্ষ্মীপুরে ২৪ কাঠা জমিতে বাগান বাড়ির তথ্য মিলেছে। এই এলাকাতেও জমির দাম শতাংশে অন্তত তিন লাখ টাকা।

শহরতলীর আমদপুর এলাকার বেরহমপুর মৌজায় স্ত্রীর নামে ১৭ বিঘা জমিও কিনেছেন লিয়াতক। এই এলাকায় প্রতি শতাংশ জমির দাম অন্তত ৫০ হাজার টাকা। এই হিসাবে দুই কোটি ৮০ লাখ টাকার জমি আছে সেখানে।

এর বাইরে ১৬টি ছোট কার্গো জাহাজ রয়েছে যা শ্বশুর বাড়ির আত্মীয় স্বজনদের নামে কেনা হয়েছে। একেকটি জাহাজের দাম অন্তত ৫০ লাখ টাকা। ফলে এই খাতেও তার ব্যয় অন্তত আট কোটি টাকা।

তিনটি বিলাসবহুল প্রাইভেট কারও ব্যবহার করেন লিয়াতক ও তার স্বজনরা। তিনি যে বেতন পান তাতে একটি গাড়ি চালাতেই পুরো খরচ চলে যাওয়ার কথা।

ফরিদপুরে দুদকের দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি- দুপ্রকের সাধারণ সম্পাদক হাসানউজ্জামান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ একজন হিসাব রক্ষক হয়ে এতো সম্পদ কী ভাবে হলো সেটা প্রশ্ন সকলের কাছে।’

নাগরিক সমাজের এই সদস্যের দৃঢ় বিশ্বাস লিয়াকতের এই সম্পদ অসৎ উপায়ে অর্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সমাজের যারা অসৎ ভাবে অর্থ উপার্যন করেছে তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা দরকার। কারণ ওই দুষ্ট চক্রকে আটক করতে না পারলে রাষ্ট্র ও সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

লিয়াকতের বিষয়ে ঢাকা টাইমসের অনুসন্ধানের পর লিয়াকতের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ রেখেছেন। ফেসবুক আইডিটিও ডিসঅ্যাবল করে ফেলেছেন তিনি।

লিয়াকতের ভাই বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘গত ৩১ জানুয়ারি দুদক আমাদের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছিল। সেখানে আমরা পারিবারিক বিভিন্ন তথ্য দিয়েছি।’

বিস্তারিত তথ্য নেই দুদকেও

লিয়াকত কাজ করেন রাজধানীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে। তিনি অ্যাজমা সেন্টার প্রকল্পের হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করেন। তিনি হজ করে ধর্মীয় লেবাস ধারণ করেছেন। এ দেখে তাকে একজন সৎ মানুষ হিসেবেই চেনেন হাসপাতালের কর্মীরা।

২০০৩ সালে স্বাস্থ্য বিভাগের (বক্ষব্যাধি হাসপাতালের) হিসাব সহকারী পদে চাকরিতে যোগ দেন আবজালের ভাই। তবে ফরিদপুরে তার সম্পদের পাহাড় তৈরি হয়েছে গত পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে। তার তার হঠাৎ ফুলেফেঁপে উঠার পর স্থানীয়দের মধ্যে ধারণা জাগে তিনি বুঝি বড় কোনো ব্যবসা করেন।

সম্প্রতি আবজালের সম্পদের তথ্য চমক তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ২৪ হাজার টাকা বেতন পেয়ে রাজধানীর উত্তরায় পাঁচটি বহুতল ভবন ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জমি ও বাড়ি, এমনকি অস্ট্রেলিয়াতেও দুই মিলিয়ন ডলারের বাড়ির খোঁজ মেলে। দুদকের জিজ্ঞাসাবাদের পর তার সব সম্পদ জব্দ হয়েছে।

এর মধ্যে গত ৩১ জানুয়ারি লিয়াকত এবং তার ভাই বেলায়েত হোসেন এবং আবজালের তিন শ্যালক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাখালী অফিসের গাড়িচালক রফিকুল ইসলাম, একই অফিসের উচ্চমান সহকারী বুলবুল ইসলাম ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিস সহকারী শরিফুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

সেদিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে লিয়াকত, বেলায়েতসহ অন্যরা গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হতে চাননি। দৌড়ে পালিয়ে যান তারা। সেদিন দুদকের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

যোগাযোগ করলে দুদকের এক কর্মকর্তা লিয়াকতের সম্পদের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাতে পারেননি। উল্টো তিনি এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানলে তা জানানোর অনুরোধ করেন।

যোগাযোগ করা হলে লিয়াকতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দুদকের উপপরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা শামছুল আলমও বলেন, ‘গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে আবজালের ছোট ভাইয়ের বিপুল পরিমাণে অবৈধ অর্থ রয়েছে, তবে তার কিছু স্বীকার করেননি তিনি।’

তবে ঢাকা টাইমসের অনুসন্ধানে ফরিদপুর শহরে লিয়াকত ও তার স্বজনদের পিলে চমকে উঠার মতো সম্পদের খোঁজ পাওয়া যায়।স্থানীয়রা জানান, লিয়াকত ও তার সবাই ঢাকায় থাকেন, মাঝেমধ্যে এলাকায় আসেন পারিবারিক কাজে বা ঈদে। তারা এলাকায় এলে সেটা মানুষকে জানান নানাভাবে। বেশ ঢাক ঢোল পিটিয়ে গরিবদের সাহায্য সহযোগিতাও করেন।

আবজাল ও তার লিয়াকতের বাবা ছিলেন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহসিলদার। পারিবারিক তেমন কোনো সম্পত্তি ছিল না। এই পরিবারটি হঠাৎ করে ফুলে ফেঁপে উঠার কারণ বুজতে পারছেন না স্থানীয়রা। এরই মধ্যে আবজালের বিষয়টি এলাকায় প্রচার হয়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে যে কিছু একটা ঝামেলা আছে সেটা বুঝে গেছেন তারা।

লিয়াকতের কর্মস্থল বক্ষব্যাধি হাসপাতালে সহকর্মীরা অবশ্য তার এই বিপুল সম্পদের তথ্য জানেন না।

হাসপাতালের পরিচালক সাঈদুর রহমান খান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সে (লিয়াকত) আমার এখানে কর্মচারী। অ্যাজমা সেন্টারের একটি প্রজেক্টে কাজ করত। আমি তাকে সেভাবে চিনি। সে হজ করেছে। দাড়ি রেখেছে। যতটুকু শুনেছি, তার ভাইয়ের অনেক সম্পদ আছে। কিন্তু তার কী আছে, সেটা আমার জানা নেই। সে এখনো চাকরি করছে।’

হাসপাতালের আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, ‘শুনেছি তার ভাইয়ের (আবজাল) অনেক টাকা পয়সা আছে। সে (লিয়াকত) তার মাধ্যমে কিছু করেছে কি না তা জানি না।’

সূত্র: বাংলাদেশ টুডে নেট

 

Please follow and like us:
20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *