যে লক্ষণগুলো দেখলে বুঝবেন আপনি মারাত্মক ক্যালসিয়াম ঘাটতিতে ভুগছেন!

ক্যালসিয়াম নামের খনিজ উপাদানটি আমাদের হাড় ও দাঁত শক্ত করে, ক্ষয় রোধ করে। স্নায়ু, হৃৎস্পন্দন, মাংসপেশির কাজেও লাগে। এর অভাবে হাড় ক্ষয় বা অস্টিওপোরাসিস রোগ হতে পারে। হাড়ের ক্ষয়রোগ প্রধানত প্রবীণদের হয়ে থাকে। হরমোনজনিত কিছু তারতম্যের কারণে প্রবীণ নারীদের এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কিছু অসুখের কারণে অনেক সময় তরুণেরাও এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। কৈশোরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম-জাতীয় খাবার গ্রহণ করলে পরবর্তী সময়ে ক্যালসিয়ামের ঘাটতিজনিত সমস্যাগুলো কম হবে।

অনেক সময় কিছু কিছু রোগে তরুণেরাও আক্রান্ত হতে পারেন। যেমন কিছু বাতজনিত সমস্যা। কোমরের বাত, আবার অন্ত্রের প্রদাহের কারণে এগুলো ব্যক্তি ঠিকমতো গ্রহণ করতে পারেন না। শরীরের যে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো থাকে যেমন: ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, খনিজ বা মিনারেল-এগুলো ভালোভাবে গ্রহণ করতে না পারলে অনেক আগেই হয়তো শরীরে অস্টিওপোরোসিস হয়ে যায়। এই খনিজ উপাদানটি খুব সহজেই শাকসবজি, দই, বাদাম ও পনিরের মত প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া সম্ভব। তারপরও বেশিরভাগ মানুষ ক্যালসিয়ামের ঘাটতিতে ভুগে থাকে।

ক্যালসিয়ামের ঘাটতির উপসর্গগুলো সম্পর্কে জেনে নিই চলুন।

১. পেশীর বাধা : পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করা ও হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক থাকার পরও যদি আপনার পেশীতে বারবার সংকোচন হয় বা টান অনুভব করেন তাহলে আপনি ক্যালসিয়ামের ঘাটতিতে ভুগছেন ধরে নিতে হবে। পেশীর সংকোচনের সাথে সাথে পেশীতে ব্যথাও হয় বিশেষ করে উরুতে ও নিম্ন পায়ের পেছনের পেশীতে। ক্যালসিয়ামের নিম্ন মাত্রার এটি প্রারম্ভিক লক্ষণ।

২. হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া : বয়স বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে শরীরের হাড়কে শক্তিশালী করে ক্যালসিয়াম। ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমে গেলে তা হাড়ের ঘনত্বের উপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। হাড়ের ঘনত্ব কমে গেলে অস্টিওপোরোসিস হওয়ার ও সামান্য আঘাতেই হাড়ে ফাটল হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়।

৩. ভঙ্গুর নখ : হাড়ের মত নখের সম্পূর্ণতা বজায় রাখার জন্যও ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। ক্যালসিয়ামের অপর্যাপ্ততা নখকে দুর্বল করে দেয় এবং নখ হয়ে উঠে ভঙ্গুর।

৪. দাঁত ব্যথা : আপনার শরীরের ৯৯% ক্যালসিয়াম থাকে হাড়ে ও দাঁতে। যদি আপনার ক্যালসিয়ামের লেভেল কমে যায় তাহলে দাঁতে ব্যথা ও দাঁত ক্ষয় হতে পারে। এছাড়াও প্যারিয়োডন্টাল ডিজিজ হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। শিশুদের ক্যালসিয়ামের ঘাটতির ফলে বিলম্বিত ও ত্রুটিপূর্ণ দাঁত হয়।

৫. ঘন ঘন অসুস্থতা : ইমিউন সিস্টেম বজায় রাখার জন্য ক্যালসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।ক্যালসিয়ামের ঘাটতি থাকে যাদের তাদের সাধারণ শ্বাসকষ্ট ও অন্ত্রের সংক্রমণে ভুগতে দেখা যায়। ক্যালসিয়ামের ঘাটতির ফলে প্যাথোজেনের হামলার বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়।

৬. অবসাদ : ক্যালসিয়ামের ঘাটতিতে যারা ভুগেন তাদের হাড় ও পেশীতে ব্যথার সাথে সাথে দুর্বলতায় ভুগতেও দেখা যায়। ক্যালসিয়ামের নিম্ন মাত্রা ইনসমনিয়া, ভয় ও মানসিক বিকৃতির সাথে সম্পর্কিত। যার ফলে স্ট্রেস ও ক্লান্তি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে আপনাকে ফ্যাকাসে দেখাবে এবং ক্লান্ত ও অলস অনুভব করবেন আপনি।

শিশুর জন্মের পরে যে সব নারীরা ক্যালসিয়ামের ঘাটতিতে ভুগেন তাদের ক্লান্ত বা অবসন্ন থাকতে দেখা যায়। তাদের বুকের দুধ কমে যাওয়া, মনোযো এছাড়াও নারীর জরায়ু ও ওভারির হরমোনের সাধারণ উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত ক্যালসিয়াম। ক্যালসিয়ামের ঘাটতির ফলে অনিয়মিত পিরিয়ড ও অতিরিক্ত রক্তপাতের সমস্যায় ভুগতে পারেন নারীরা।

কেউ বললেই ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাবে? একটু হাত-পা ব্যথা, জোড় বা জয়েন্টের ব্যথা, শরীর ম্যাজম্যাজ করছে বা বয়স হয়েছে বলেই ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খেতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কেননা, দৈনন্দিন নানা খাবারেও পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম আছে। প্রতিদিন এ রকম খাবার থেকেই ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করা যায়। অনেকে আবার নিজে নিজেই ওষুধের দোকান থেকে কিনে ক্যালসিয়াম বড়ি খান, যা ঠিক নয়। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধটি সেবন করতে হবে।

শরীরে ভিটামিন ‘ডি’র অভাব থাকলে কিন্তু ক্যালসিয়াম থেকে উপকার পাওয়া যাবে সামান্যই। অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণে কিডনিতে পাথর পর্যন্ত হতে পারে। আবার যাঁদের আগে কখনো কিডনিতে পাথর হয়েছিল, তাঁদের অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণে পুনরায় পাথর হওয়ার আশঙ্কা আরও বেশি। তাই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করার সময় তথ্যটি সবার আগে জানবেন। কারণ ওষুধের মাত্রা ঠিক করতে এবং সমস্যাটির জন্য বাড়তি যেসব সতর্কতা প্রয়োজন তা নির্ধারণে তথ্যটি ভূমিকা পালন করবে।

ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট ছাড়া কীভাবে সমাধান পেতে পারি?

দুধ, দই, পনির, কাঁচা বাদাম, সয়াবিন, আখরোট, সামুদ্রিক মাছ, কাঁটাযুক্ত ছোট মাছ, কালো ও সবুজ কচুশাক, শজনেপাতা, পুদিনাপাতা, সরিষাশাক, কুমড়ার বীজ, সূর্যমুখীর বীজ, চিংড়ি শুঁটকি, ডুমুর ইত্যাদি হলো উচ্চ ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার। ১০০ গ্রাম দুধে ক্যালসিয়াম আছে ৯৫০ মিলিগ্রাম, একই পরিমাণ পাবদা মাছে ৩১০ মিলিগ্রাম, সামুদ্রিক মাছে ৩৭২ মিলিগ্রাম, শজনেপাতায় ৪৪০ মিলিগ্রাম, ট্যাংরা মাছে ২৭০ মিলিগ্রাম। এক কাপ টকদইয়ে থাকে আরও বেশি ৪০০ মিলিগ্রামের মতো।

আধা বাটি রান্না করা সবুজ পাতা আছে এমন শাক খেলে ১০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম খাওয়া হবে। এক গ্লাস কমলার রসে ১৫০ থেকে ২০০ মিলিগ্রাম। তবে অন্ত্রে ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা দেয় কিছু জিনিস, যেগুলো ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবারের সঙ্গে না খাওয়াই ভালো। যেমন উচ্চমাত্রার চর্বি ও অক্সালিক অ্যাসিডযুক্ত খাবার।

চকলেট, পালংশাক, কার্বোনেটযুক্ত পানীয় ইত্যাদিও ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা দেয়। কিন্তু ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে ভিটামিন এ, সি এবং ডি। আয়রনও ম্যাগনেশিয়ামযুক্ত খাবারও ক্যালসিয়ামের কাজে সাহায্য করে।

Please follow and like us:
20

11 thoughts on “যে লক্ষণগুলো দেখলে বুঝবেন আপনি মারাত্মক ক্যালসিয়াম ঘাটতিতে ভুগছেন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *