কেমন হবে ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন এবং হাইপারলিপিডেমিয়া রোগের খাদ্যাভ্যাস?

বর্তমানে অনেক রোগের মধ্যে কিছু রোগ খুবই পরিচিত। এগুলো রোগের মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন), হাইপারলিপিডিমিয়া অর্থাৎ রক্তে কোলেস্টেরলসহ অন্য ঝুঁকিপূর্ণ ফ্যাট এর পরিমাণ বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি অন্যতম। এই রোগ গুলোতে প্রায়ই কাবু হয়ে পড়েন অনেক রোগীই তবে আমরা অনেকেই  জানি না খুব ছোট ছোট কিছু খাদ্যাভাস কিন্তু এসব রোগের খারাপ প্রভাব থেকে অনেকটাই পরিত্রাণ দিতে পারে। আজ এমন কিছু খাদ্যাভাস নিয়েই আলোচনা করবো।

ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগের খাদ্যাভাস:
ডায়াবেটিস মানেই কিন্তু সব ধরণের খাবার থেকে দূরে থাকা নয় বরং এমন অনেক খাবার আছে যা সহজেই আপনাকে ডায়াবেটিস রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে।

সাধারণত ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য জটিল শর্করার খাবার যেমন:  ভূট্টা, যব, ভূসিসমেত আটার রুটি  ইত্যাদি খুবই দরকারি।যদি আপনি ডায়াবেটিক রোগী হয়ে থাকেন তাহলে প্রতিদিনের খাবারে যোগ করুন আঁশ জাতীয় খাবার। যেমন: সবুজ শাক সবজি, ডাল, কালোজাম, পেয়ারা, আপেল, মটরশুঁটি এবং প্রায় সব ধরণের টক ফল। দিনে অন্তত ২০-২৫গ্রাম আঁশ  জাতীয় খাবার খাওয়া উচিত একজন ডায়াবেটিক পেশেন্টের।

প্রোটিন জাতীয় খাবার যেমন: ডিম, দুধ, টকদই, পনীর, বড় ও ছোট মাছ, মুরগি, ডাল, বীচি ইত্যাদি এই রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয়।

একজন ডায়াবেটিক রোগীকে অবশ্যই চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণে সচেতন হতে হবে, পারলে এড়িয়ে যাওয়া ভালো। তবে সেক্ষেত্রে মাছের তেল এবং অলিভ অয়েল ডায়াবেটিক রোগীর জন্য উপকারী।

এবার আসি এমন কিছু খাবার এর কথায় যার গ্রহণ একজন ডায়াবেটিক রোগীর জন্য অতিমাত্রায় ক্ষতিকারক এবং অবশ্যই হিসেব করে খেতে হবে। যেমন : চিনি, মধু, গুড়, মিষ্টি,  জ্যাম, জেলি,  কোমল পানীয়, দুধের সর, আইসক্রিম,  কেক, বেকারী খাবার, মিষ্টি বিস্কুট, হালুয়া, পাকা কলা, খেজুর, কিসমিস, আঙুর,  আখের রস,  মাটির নিচের সব্জি,  ঘি, ডালডা, ভাজাভুজি,  গলদা চিংড়ি,  মগজ, চর্বি জাতীয় মাংস(গরু,খাসী)ইত্যাদি।

আসলে ডায়াবেটিস মানেই সব খাবার পরিত্যাগ নয় বরুং কিছু কিছু খাবার কিন্তু রক্তে গ্লুকোজ লেভেল কমাতেও সাহায্য করে যেমন : মেথি, করলা, কালোজাম,  কালোজিরা, দারুচিনি। সুতরাং এসব মেনে চললে কিন্তু খুব সহজেই নিয়ন্ত্রন করা যায় ডায়াবেটিস নামক ব্যাধিটিকে।

হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ:
এখন হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ এতটাই বেশি হচ্ছে যে অনেক প্রবীণ বয়স্ক মানুষের পাশাপাশি কম বয়স্ক মানুষদের মাঝেও দেখতে পাওয়া যায়। সহজ জীবন যাপন এবং অল্প কিছু খাবার এর পরিত্যাগ আর বেশ কিছু খাবারকে প্রতিদিনের খাবার তালিকায় যোগ করে নিলেই পাওয়া যেতে পারে এই রোগের সুন্দর নিয়ন্ত্রিত সমাধান।

প্রথমেই বলি কি কি খাবার যোগ করতে পারেন আপনি এই রোগের সমাধানে তাজা ফল যেমন: লেবু, জাম্বুরা, পেয়ারা, আমলকী,  কামরাঙা, আপেল, কমলা, মাল্টা,  পেস্তাবাদাম,  ডালিম, কলা, নাশপাতি,  পেঁপে ইত্যাদি।

এছাড়া সবুজ শাক সবজি যেমন: প্রায় সব ধরণের সবুজ শাক(পালং শাক,কলমি শাক,মূলা শাক,পাট শাক ইত্যাদি), এবং বাধাঁকপি, ফুলকপি, টমেটো, শসা,  মূলা, লাউ, মটরশুঁটি, ঢেড়স, বেগুন, কুমড়ো ইত্যাদি। এছাড়া খেতে পারেন প্রোটিন জাতীয় প্রায় সব ধরণের খাবার (চর্বি জাতীয় মাংস, কলিজা, চিংড়ি, ডিমের কুসুম বাদ দিয়ে )।

এখন আসি যেসব খাবার একজন উচ্চ রক্তচাপের রোগীর অবশ্যই পরিত্যাগ করা উচিৎ- লবণ এবং বেশি লবণযুক্ত খাবার, সস, চাটনি,  আচার, ভাজাভুজি,  চানাচুর,  নোনতা বিস্কুট,  নোনতা মাখন, ঘি, ডালডা, অতিরিক্ত তেলের খাবার, কেক, পেস্ট্রি, নুডলস, পরোটা,  লুচি, আইসক্রিম ইত্যাদি।

একজন উচ্চ রক্তচাপের রোগীর অবশ্যই এবং অতি অবশ্যই তেল, চর্বি এবং অতিরিক্ত লবণ জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। তবে উচ্চ রক্তচাপ কমাতে  বাদাম,  পেয়াজ, ডালিম, আপেল, শালগম,  তিসি, ডার্ক চকোলেট,  কালোজিরা,  চালতা একদম টনিকের মতোই কাজ করে।

হাইপারলিপিডেমিয়া বা হাই কোলেস্টেরল:
মূলত রক্তে কোলেস্টেরল, LDL এর মাত্রা বেড়ে গেলেই হাইপারলিপিডেমিয়া দেখা যায় তাই অতি অবশ্যই যে সকল খাবারে কোলেস্টেরল এবং LDL এর মাত্রা বেশি সেগুলো বেছে চলতে হবে। সাধারণত এই রোগী দের প্রতিদিনের খাবারে ডাল, বীচি, তিল, ভুট্টা,  অলিভ ওয়েল, মাছ, তাজা ফল, সবুজ শাক সবজি, স্যুপ, সালাদ, লেবু,  ডিমের সাদা অংশ,  মাছ,  তেঁতুল,  রসুন, পেঁয়াজ ইত্যাদি।

রঙ্গিন শাকসবজি একই সাথে  ভিটামিন, মিনারেল এবং আঁশ এর উৎস। আঁশ শরীরের অতিরিক্ত লিপিড বা ফ্যাট বের করে নিয়ে যায়।

এছাড়া কম তেলযুক্ত খাবার খাওয়াই হবে সব চেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কিছু কিছু খাবার তবে বর্জন করতে হবে যেমন: পরোটা, লুচি, ভাজাভুজি, গরুর মাংস, খাসীর মাংস, মগজ, চিংড়ী, আচার, চাটনি, বেকারি জাতীয় খাবার, বিস্কুট, কেক, আইসক্রিম, ক্রিম, দুধের সর, ঘি, ডালডা, মাখন ইত্যাদি প্রায় সব তেল জাতীয় খাবার।

সুতরাং কিছু খাবার নিজের খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে আর কিছু কিছু খাদ্যাভ্যাস যোগ করে আপনি ভালো থাকতে পারেন সহজেই। ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, হাইপারলিপিডেমিয়া এই তিনটি রোগ কেই সুষম খাদ্যগ্রহনে নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব। কোনগুলো উপকারী কোনগুলো ক্ষতিকর খাদ্য তা জেনে নিন, পারলে একজন দক্ষ নিউট্রিশনিস্ট এর কাছে খাদ্যতালিকা করে নিন। যথাযথভাবে এগুলো অনুসরণ করে সুস্থ থাকুন।

লেখক-মারিয়া আয়শা, খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ।

Please follow and like us:
20

One thought on “কেমন হবে ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন এবং হাইপারলিপিডেমিয়া রোগের খাদ্যাভ্যাস?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *