মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে কি করবেন?

মাইগ্রেন সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? যা জানি তা সঠিক তো? সব মাথাব্যথাই কি মাইগ্রেন? অবশ্যই সব মাথাব্যথা মাইগ্রেন নয়।

মাইগ্রেন কি?
মাইগ্রেন আসলে খুবই পরিচিত শব্দ তবুও বেশ অপরিচিত একটি বিষয়। National Institute of Neurological Diseases এর গবেষণা অনুযায়ী বলা যায়, মাইগ্রেন একটি স্নায়বিক ব্যধি, যার পুনরাবৃত্তি ঘটে আর এক্ষেত্রে মাথার এক পার্শ্বে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয় এবং এর সাথে বমি বা বমিভাব, আলো ও শব্দের প্রতি সংবেদনশীলতা পরিলক্ষিত হয়।

মাইগ্রেনের সঠিক কারন এখনও জানা যায় নি। তবে ধারনা করা হয় যে, কোন কারনে মস্তিষ্কের রক্তনালীতে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পেলে মাইগ্রেনের সূচনা ঘটে। মাইগ্রেন সাধারনত ৪-৭২ ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে এর স্থায়ীত্বকাল বৃদ্ধি পায়। Journal of Neurology , Neurosurgery and Psychiatry এর মতে প্রতি ১০ জনে একজন মাইগ্রেন রোগী। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের মাইগ্রেনে আক্রান্ত হওয়ার অনুপাত বেশি।

মাইগ্রেনের লক্ষণঃ বিভিন্ন গবেষণা হতে দেখা যায় যে, মাইগ্রেনের ব্যথা আরম্ভ হওয়ার পূর্বে অনেকের মাঝেই কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। যেমন-

  • চোখে ঝাপসা দেখা বা সাময়িক অন্ধকার দেখা
  • চোখের সামনে কিছু জিগ-জ্যাগ বা আকাঁবাকাঁ লাইন দেখা
  • বমিভাব
  • চোখের ও মাথার পিছনে ব্যথা

মাইগ্রেনের কারণঃ American Migraine Foundation এর একটি গবেষণা মতে  মাইগ্রেন রোগীদের পারিবারিক ইতিহাস থেকে জানা যায় যে তাদের পরিবারের সদস্যদেরও মাইগ্রেন ছিল। তাই মাইগ্রেন কে জেনেটিক বা বংশগত রোগও বলা যায়। যদিও পরিবেশ, জীবন-যাপনের ধরন এবং খাদ্যাভ্যাস মাইগ্রেন এর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

মাইগ্রেনের সঠিক কারন জানা না গেলেও রোগীদের উপর বিভিন্ন সময়ে করা গবেষণা হতে মাইগ্রেন উদ্রেককারী কিছু বিষয় উঠে এসেছে। যেমন-

  • মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ
  • আবহাওয়ার পরিবর্তন
  • পরিমিত ঘুম না হওয়া বা অতিরিক্ত ঘুমানো
  • কোন বেলার খাবার বাদ দিলে
  • খাদ্যাভ্যাসে আমূল পরিবর্তন
  • রক্তে গ্লুকোজ এর পরিমান হ্রাস পেলে

এছাড়াও মেয়েদের মাসিকের পূর্বে বা মাসিক চলাকালীন সময়ে মাইগ্রেন এর উদ্রেক হতে পারে। প্রায় ৫০% মেয়ে এসময়ে মাইগ্রেনে আক্রান্ত হয়।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় যে অনেকের কিছু খাবার গ্রহণের জন্য মাইগ্রেন শুরু হয়ে থাকে। এরকম কয়েকটি খাবারের কথা উল্লেখ করা হল-

  • পুরোনো পনির
  • অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার
  • চকোলেট
  • বাদাম
  • আইস-ক্রিম
  • দই
  • টক দই
  • মনো-সোডিয়াম গ্লুটামেট বা টেস্টিং সল্ট
  • খাদ্যকে আকর্ষনীয় করার জন্য ব্যবহৃত রাসায়নিক
  • ক্যাফেইন জাতীয় খাবার
  • টমেটো
  • কোমল পানীয়
  • সামুদ্রিক খাবার
  • টক ফল
  • অ্যালকোহল জাতীয় পানীয়

প্রত্যেকের একই খাবার গ্রহণের ফলে মাইগ্রেন এর উদ্রেক হয় তা নয়, মানুষভেদে এর ভিন্নতা দেখা দেয়। আবার অনেকের উক্ত খাবারগুলোর বাইরেও কিছু খাবার গ্রহনে সমস্যা দেখা যায়। আপনার কোন খাবারে মাইগ্রেন এর সমস্যা হচ্ছে তা জানার জন্য গবেষকেরা আপনার দৈনিক খাদ্যাভ্যাস এর তালিকা টুকে রাখার কথা বলে থাকেন। বিশেষ করে মাইগ্রেন এর ব্যথা আরম্ভ হওয়ার আগে কী খাবার খেয়েছিলেন এবং সেই খাবার এর জন্যে পরবর্তীতেও মাইগ্রেন এ আক্রান্ত হন কি না তা পর্যবেক্ষণ করে নির্ধারন করতে হবে আপনার কোন খাদ্যে মাইগ্রেন এর ব্যথা আরম্ভ হয় এবং সে খাদ্যগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।

মাইগ্রেন প্রতিরোধে করনীয়ঃ এখন পর্যন্ত মাইগ্রেন এর কোন চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি। তবে কিছু খাদ্য উপাদান যেমন- ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি খনিজ উপাদান সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহন করলে তা সাময়িক ভাবে ব্যথার তীব্রতা হ্রাস করতে সক্ষম হয় যা গবেষণালব্ধ। তেমন কিছু খাদ্য নিম্নরূপ-

(১) পালং শাকঃ পালং শাকে আছে রিবোফ্লেভিন বা ভিটামিন বি২ যা শক্তি বিপাকে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখে। আর বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে মস্তিষ্কের পেশীগুলোয় শক্তি বিপাকের অস্বাভাবিকতার জন্য মাইগ্রেন এর ব্যথা উঠতে পারে। তাই পালং শাক গ্রহণে মাইগ্রেন এর ব্যথা কিছুটা উপশম হতে পারে। তাছাড়া পালং শাকে ম্যাগনেসিয়াম ও ক্যালসিয়াম রয়েছে যা মাইগ্রেন এর তীব্রতা হ্রাসে সহায়ক।

(২) ব্রোকলিঃ ব্রোকলিতে রয়েছে কো-এনজাইম Q10 যা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে মাইগ্রেন এর ব্যথা উপশমে ভূমিকা রাখে। এছাড়া এতে রয়েছে প্রচুর ম্যাগনেসিয়াম। ম্যাগনেসিয়াম মস্তিষ্কের রক্তনালীতে অতিরিক্ত রক্ত চলাচল নিয়ন্ত্রন করে ব্যথা নিরাময় করতে সাহায্য করে।

(৩) তুলসি পাতাঃ তুলসি পাতায় রয়েছে মেনথল জাতীয় উপাদান যা স্নায়ুকে শিথিল করে মাইগ্রেন এর তীব্রতা কমায়। তাই মাইগ্রেন এর ব্যথা উঠলে কয়েকটি তুলসি পাতা চিবালে ব্যথা অনেকটাই কমে যেতে পারে।

(৪) আদাঃ আদাকে বলা হয় প্রাকৃতিক প্রদাহ-বিরোধী উপাদান যা মাইগ্রেন এর বিপরীতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। মাইগ্রেন এর ব্যথা উঠলে আদা কুঁচি চিবালে ব্যথা অনেকাংশে দূর হতে পারে।

(৫) মিষ্টি আলুঃ মিষ্টি আলুতে রয়েছে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স এবং ম্যাগনেসিয়াম, কপার, ফসফরাস জাতীয় খনিজ উপাদান যা মাইগ্রেন এর বিপরীতে কাজ করে।

(৬) ক্যাফেইনজাতীয় উপাদানঃ ক্যাফেইন মস্তিষ্কের ফুঁলে উঠা রক্তনালীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। মাইগ্রেন এর ফলে যে রক্তনালীগুলো দিয়ে অতিরিক্ত রক্ত চলাচল করে তা কমিয়ে দিতে পারে এক কাপ চা অথবা কফি।

(৭) ডিমঃ ডিমে রয়েছে রিবোফ্লেভিন ও নায়াসিন এবং কিছু খনিজ উপাদান যা মাইগ্রেন প্রতিরোধে কিছুটা ভূমিকা রাখে।

(৮) গরু বা খাসির মাংসঃ Red meat বা গরু বা খাসির মাংস ও কলিজায় রয়েছে রিবোফ্লেভিন বা ভিটামিন বি২ এবং কো-এনজাইম Q10, উভয় উপাদান ই মাইগ্রেন এর বিপরীতে কাজ করে। তবে উভয় প্রকার মাংসই অতিরিক্ত গ্রহণে উপকারের থেকে অপকারই বেশি হবে।

(৯)বীঁচি ও বাদামঃ কাঠ বাদাম, পেস্তা বাদাম, কাজু বাদাম, তিল, সূর্যমূখি বীজ ইত্যাদিতে রয়েছে প্রচুর পরিমান ম্যাগনেসিয়াম যা মাইগ্রেন এর ব্যথা হ্রাসে ভূমিকা রাখে।

উক্ত খাদ্যগুলোর কোনটির জন্য যদি কারো মাইগ্রেন এর উদ্রেক হয়ে থাকে তবে তার ক্ষেত্রে মাইগ্রেন উদ্রেককারী খাদ্যটি ব্যথা উপশমে গ্রহণ করা উচিৎ নয়।

লক্ষণীয়ঃ মাইগ্রেন রোগীদের কয়েকটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখা উচিৎ। যেমন-

  • কোন বেলার খাবার বাদ না দেওয়া। বিশেষ করে যদি এর ফলে পূর্বেও মাইগ্রেন এর উদ্রেক ঘটে থাকে।
  • অনেকক্ষণ খালি পেটে না থাকা।
  • পর্যাপ্ত পরিমানে পানি পান করা। কেননা অনেক সময় দেখা যায় যে দেহে পানির ঘাটতি হলে মাইগ্রেন এর ব্যথা শুরু হতে পারে।
  • এমন খাবার বর্জন করা যা খেলে মাইগ্রেন এর ব্যথা উঠবে বলে জানা আছে।
  • অতিরিক্ত টেনশন না করা।
  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া।
  • বেশিক্ষণ কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহার থেকে বিরত থাকা।
  • কোন কারনে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হলে একেবারে পরিবর্তন না করে ধীরে ধীরে করা

মাইগ্রেন এর ব্যথার জন্য যেসকল ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলো তীব্র ব্যথানাশক এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যুক্ত। তাই এক্ষেত্রে যতটা সম্ভব খাদ্য উপাদান দিয়ে এবং সচেতন জীবন-যাপন এর মাধ্যমে মাইগ্রেনকে প্রতিহত করা উচিৎ। কিন্তু গুরুতর অবস্থায় অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ অনিবার্য।

লেখক-জিনাতুল জাহরা ঐশী, খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ।

Please follow and like us:
20

One thought on “মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে কি করবেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *