ডায়াবেটিস, হাই- কোলেস্টেরল এবং অতিরিক্ত ওজনে ডিম কি আসলেই ক্ষতিকর?

ডিম একটি সুস্বাদু এবং সহজে পাচন যোগ্য খাবার। এছাড়া ডিম দিয়ে অনেক রকমের খাবার তৈরি হয় যা না খাওয়া রীতিমত কষ্টের ! কিন্তু বিভিন্ন শারীরিক অবস্থা যেমন- ডায়াবেটিস, হাই- কোলেস্টেরল এবং অতিরিক্ত ওজনে অনেক কেই দেখা যায় ডিম খাওয়া কমিয়ে দেন। কারণ এতে  ফ্যাট আছে!

এখন অনেকের প্রশ্ন-  ডায়াবেটিস, হাই- কোলেস্টেরল এবং অতিরিক্ত ওজনে ডিম কি আসলেই ক্ষতিকর?

খুশির খবর হল পরিমিত পরিমান ডিম ( প্রতিদিন ১ টি ডিম) খেলে কোন সুস্থ মানুষের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে না।কারন গবেষণাই দেখা গেছে,ডিমের কোলেস্টেরল আমাদের রক্তের কোলেস্টেরল খুব একটা বাড়াইনা যা আমরা আগে ভাবতাম।

U.S. Dietary Guideline (2016) সুপারিশ করেছে প্রতিদিন ৩০০ মিলি গ্রাম কোলেস্টেরল গ্রহন করার জন্য, আমদের জাতীয় খাদ্য নির্দেশিকাতে যার অনুমোদন রয়েছে >২৫০ মিলি গ্রাম। একটা ডিমে মোট কোলেস্টেরল পাওয়া যাই ১৮৪ মিলি গ্রাম যার সবটুকু থাকে ডিমের কুসুমে।

অর্থাৎ, যাদের ডায়াবেটিকস, ওজন আধিক্য বা স্থুলতা, হৃদরোগ জনিত সমস্যা আছে বা অন্যান্য স্বাস্থ্য জনিত সমস্যা আছে তারা, তাদের পুষ্টিবিদের সাথে পরামর্শ করে খাদ্য তালিকাই ডিম অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।

আসুন জেনে নেই ডিমের পুষ্টি গুনাগুনঃ  

ডিমের আমিষকে সম্পূর্ন আমিষ বলা হয়, কারন ডিমের যেসকল অত্যাবশকীয় অ্যামাইনো এসিড রয়েছে তার সুবিন্যাস্ত বিন্যাস, মানুষের দেহের আমিষের সুবিন্যাস্ত বিন্যাসের সাথে অনেকটাই মিলে যায়। এইসব কারনে ডিমকে মাংসের সাথে শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে।

ডিমের সাদা অংশ যেহেতু সম্পূর্ন আমিশ,তাই দেহের প্রতিদিনের চাহিদা, ক্ষয়পূরণ ও কোষের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

ডিমের কুসুমে রয়েছে কোলেস্টেরল যার ক্ষতিকর দিক এর চেয়ে উপকরী দিকই বেশি রয়েছে। এটি আমাদের শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় ধাপে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

যেমনঃ ‘ভিটামিন ডি’ তৈরি করে, স্টেরয়েড হরমোন –   ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন, টেসস্টেরন ইত্যাদি উৎপাদন করে, পিত্তরস উৎপাদন করে যা আমাদের পরিপাকে সাহায্য করে। এছারা, আমাদের দেহে যখন খাবারের মাধ্যমে দৈনিক চাহিদার থেকে বেশি কোলেস্টেরল গ্রহন করি, আমাদের যকৃত তখন কম পরিমানে কোলেস্টেরল তৈরী বা উৎপাদন করে,যার ফলে আমদের রত্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা একই বা কিছুটা বৃদ্ধি পায়।

ডিম  গ্রহনের উপকারিতাঃ
ডিম গ্রহনের অন্যান্য উপকারীতা রয়েছেঃ
১) খাবার খাওয়ার ইচ্ছা কমায়ঃ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে,ডিম খাওয়ার পরে যকৃতে পূর্ণ ভাব অনুভূত হয় এবং খাবার খাওয়ার চাহিদা কমায়,যা পরবর্তী খাবার খাওয়ার থেকে কম গ্রহনে সাহায্য করে।

২) ওজন কমাতে সাহায্য করেঃ ডিমের মধ্যে যে উচ্চমাত্রার আমিষ রয়েছে তা দেহের বিপাকীয় গতি বৃদ্ধি করে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে।

৩) মতিষ্কের স্বাস্থ্য উন্নত করেঃডিম হচ্ছে কলিন ‘choline’ এর সবচেয়ে ভালো উৎস, যা আমাদের মতিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৪) চোখের রোগের প্রবণতা কমায়ঃ ‘লুটিন’ এবং ‘জিয়াজ্যান্থিন’ নামক অ্যান্টি-অক্রিডেন্ট ডিমের মধ্যে পাওয়া যায়,যা চোখের রোগের থেকে চোখকে রক্ষা করে, যেমনঃ ক্যাটার্যা ক্ট এবং ম্যাকুলার ডিজেনারেশন।

৫) প্রদাহ কমায়ঃ ডিম প্রদাহজনিত সমস্যা কমায়,যা বিভিন্ন রোগের সাথে সম্পর্কীত।

# ডিমের বায়োলোজিক্যাল ভ্যালু বা জৈব মূল্যঃ
ডিমের আমিষ হল সম্পূর্ন আমিষ যার মধ্যে নয়টি (৯) অত্যাবশকীয় অ্যামাইনো এসিড পাওয়া যায়, যদিও একই সাথে নয়টি অনাত্যাবশকীয় অ্যামাইনো এসিডও উপস্থিত থাকে।গবেষকদের মতে, ডিমের আমিষ, অন্যান্য প্রানীজ আমিষের থেকে ভাল।শুধুমাত্র অত্যাবশকীয় অ্যামাইনো এসিডের উপর ভিত্তি করে ডিমের আমিষকে মাতৃদুগ্ধের পরে দিতীয় অবস্থানে রাখা হয়েছে.একটি বড় আকারের ডিমে উচ্চমাত্রার আমিষ রয়েছে,যার পরিমান ৬.২৯ গ্রাম।(১২.৬% DRV অনুসারে)।

নিম্নে কিছু খাদ্যের জৈবমূল্যের তালিকা দেওয়া হলঃ
বিভিন্ন খাদ্যে আমিষের জৈবমূল্য

খাদ্যের নাম জৈবমূল্যের পরিমান
দুধ ৯৩.৭
ডিম ৮৪.৫
মাছ ৭৬.০
গরুর মাংস ৭৪.৩
সয়াবীন ৭২.৪
ভাত(মিলে ছাঁটা) ৬৪.০
গম (খোসাসহ পুরোটা) ৬৪.০
ভূট্টা ৬০
বীজ (শুকনা) ৫৮.০
(উৎসঃ United States Department of Agriculture(USDA), 2015)

ডিমের উপাদানসমূহঃ 
ডিমের দুইটি অংশ রয়েছে। যথাঃ সাদা অংশ এবং হলুদ অংশ যা ডিমের কুসুম নামে পরিচিত।

একটি ডিমের মোট ওজনের( ৪০-৫০ গ্রাম) ৩০গ্রাম ডিমের সাদা অংশ, যা থেকে শক্তি পাওয়া যায় ২৮.৯০ কিলোক্যালোরি, আমিষ ২.৬৬ গ্রাম্‌ খনিজ লবনের মধ্যে কালসিয়াম ২ মিলিগ্রাম, লোহা ০.০৩ মিলিগ্রাম, জিঙ্ক ০.০১ মিলিগ্রাম, তামা ০.০০৮ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ০.০০৪ মিলিগ্রাম, সেলেনিয়াম ৬.৬ মিলিগ্রাম পাওয়া যায়।

ডিমের সাদা অংশে ভিটামিনও রয়েছে, এর মধ্যে থায়ামিন ০.০০১, রিবোফ্ল্যাভিন ০.১৪৫, নায়াসিন ০.০৩৫, কোলিন ০.৪, কোবালঅ্যামিন ০.০৩ মিলিগ্রাম পাওয়া যাই।

ডিমের সাদা অংশে চবি পরিমান শূন্য, তাই কোলেস্টেরলও নেই। ডিমের সাদা অংশ আমিষের খুব ভাল উৎস। এর মধ্যে রয়েছে আমদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড যা আমাদের শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না।

ডিমের মধ্যে যে অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইন এসিড রয়েছে সেগুলো হলঃ ট্রিপটোফ্যান ০.০৪ , থ্রিওনিন ০.১৪৮, আইসো লিওসিন ০.২১৮, লিওসিন ০.৩৩৫ ,মিথ্রিওনিন ০.১৩২, ফিনাইল অ্যালানিন ০.২২৬, টাইরোসিন ০.১৫১, ভ্যালিন ০.২৬৭, আরজিনিন ০.২১৪, হিস্টিডিন ০.০৯৬ মিলিগ্রাম। (উৎস ;United States Development of Agriculture,2015)

ডিমের কুসুমে প্রতি ১০গ্রামে শক্তি পাওয়া যায় ১৭.১ কিলক্যালরি, আমিষ পাওয়া যায় ২.৭০ গ্রাম, মোট লিপিড পাওয়া যায় ৪.৫১ গ্রাম। খনিজ লবনের মধ্যে রয়েছে ক্যালসিয়াম ২২, লহা ০.৪৬, ম্যাগনেসিয়াম ১, ফসফরাস ৬৬, সোডিয়াম ৮, জিঙ্ক ০.৩৯, তামা ০.০১৩, সেলেনিয়াম ৯.৫ মিলিগ্রাম।

ডিমের কুসুমে ভিটামিনের মধ্যে থায়ামিন ০.০৩, রিবোফ্ল্যাভিন ০.৯০, নায়াসিন ০.০০৪, প্যানটোথেনিক ০.৫০৮, কোলিন ১৩৯.৪, বিটা – ক্যারোটিন ১৫, রেটিনল ৬৩, আলফা- ক্যারোটিন ৬। লুটিন+ জিয়াজ্যান্থিন ১৮৬, ভিটামিন ই ০.৪৪, ভিটামিন (ডি২+ডি৩)০.৯, ভিটামিন ডি৩ (কোলক্যালসিফেরন) ০.৯, ভিটামিন ডি ৩৭, ভিটামিন কে ০.১ মিলিগ্রাম।

ডিমের কুসুমের অ্যামাইনো এ্যাসিডের মধ্যে ট্রিপটোফ্যান ০.০৩০, থ্রিওনিন ০.১১৭, আইসো লিউসিন ০.১৪৭, লিউসিন ০.২৩৮,লাইসিন ০.২০৭, মিথিওনিন ০.০৬৪, সিসটিন ০.০৪৫, ফিনাইল অ্যালানিন ০.১১৬, টাইরোসিন ০.১১৫, ভ্যালিন ০.১৬১, আরজিনিন ০.১৮৭, হিস্টিডিন ০.০৭১, অ্যালানিন ০.১৪২, এসপারটিক এসিড ০.২৬৪ মিলিগ্রাম।

ডিমের কুসুমে মোট চর্বির পরিমান ১.৬২৪ গ্রাম।যার মধ্যে অম্পৃত্ত চর্বি রয়েছে মোট ১.৯৯৫, বহু অসম্পৃত্ত চর্বি রয়েছে মোট ০.৭১৫ এবং কোলেস্টেরল পাওয়া যায় ১৮৪ মিলিগ্রাম।

((উৎসঃ United States Development of Agriculture, 2015)

সুতরাং  ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, অতিরিক্ত ওজনে ডিম  আসলেই ক্ষতিকর নয়।

তথ্যসূত্রঃ অনলাইন

Please follow and like us:
20

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *